
বদনজরের প্রভাবে অসুস্থতা
শাইত্বান তার 'আইন (বদনজর) বা হাসাদ(হিংসা)র মাধ্যমে শরীরের যেকোনো অর্গান ড্যামেজ করে দিতে পারে, অসুস্থ করে দিতে পারে, মরণব্যাধি রোগেও আক্রান্ত করতে পারে। দ্বীন-ইমান বিধ্বস্ত করে দিতে পারে।
বদনজর বা হিংসার কথা আসলেই আমরা মূলত ভাবি কোনো মানুষের দেয়া বদনজর ; বাস্তব হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা বদনজরে আক্রান্ত হয় তা মূলত শরীরের ভিতরে থাকা শাইত্বান, যে তাকে বদনজর দেয়(অথবা কোনো মানুষ বদনজর দিলে অই ব্যক্তির শরীরে থাকা শাইত্বান সেই বদনজরের প্রভাব কে আরো প্রসারিত করে) কিংবা বাহিরের শাইত্বান। শাইত্বান তার সুস্বাস্থ্যের উপর বদনজর দিয়ে অসুস্থ করে তোলে, মানসিক প্রশান্তির উপর বদনজর দিয়ে বিক্ষিপ্ত-অস্থির করে তোলে, রিযিকের পথে বাধা সৃষ্টি করে ইত্যাদি। মূলত মানুষের বদনজরে যা যা হয় জিনের বদনজরেও তা-ই ঘটে। ক্বুরআন-হাদীস থেকে আমরা এর বাস্তবতা দেখি:
১,
وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
অর্থঃ
পিতা বলল, ‘হে আমার সন্তানেরা! তোমরা এক দ্বার দিয়ে (মিসরে) প্রবেশ কর না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে (মানুষের কুদৃষ্টি এড়ানোর জন্য)। আমি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে তোমাদের কোনই উপকার করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া হুকুম দাতা কেউ নেই, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি, যারা নির্ভর করতে চায়, তারা তাঁর উপর নির্ভর করুক।’
আয়াতে ইয়াকুবের (আলাইহিস সালাম) উক্ত নির্দেশনার ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) মুহাম্মাদ বিন কা'ব, মুজাহিদ, যাহহাক, কাতাদা এবং সুদী (রাঃ) প্রমুখ বলেছেন যে, এমনটি তিনি বদ নজরের ভয়ে বলেছিলেন। কেননা তার সন্তানরা খুবই সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তাই তাদের উপর লোকদের বদনজরের আশঙ্কা করে উক্ত নির্দেশ দেন । কেননা বদনজরের ক্রিয়া বাস্তব; কিন্তু পরে তিনি এও বলেনঃ তবে এ ব্যবস্থা আল্লাহর তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারবে না। তিনি যা চাবেন তাই হবে----------- পরিশেষে তা তাদের জন্য বদনজর হতে প্রতিরোধক হিসেবেই আল্লাহর হুকুমে কাজ হয়েছিল------- সংক্ষিপ্ত । (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ২/৪৮৫)
২,
وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ
অর্থঃ কাফিররা যখন উপদেশ বাণী (কুরআন) শ্রবণ করে তখন তারা যেন তাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়িয়ে ফেলতে চায় এবং বলেঃ সে তো এক পাগল। (সূরা কলামঃ ৫১)
হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, (لَيُزْلِقُونَكَ) “তোমার প্রতি বদনজর দিবে।” অর্থাৎ তারা তোমাকে হিংসার প্রতিফলন ঘটিয়ে রুগী বানিয়ে দিবে যদি আল্লাহর তোমার প্রতি হেফাযত না থাকে। আয়াতটি প্রমাণ বহন করে যে, বদনজরের কুপ্রভাবের বাস্তবতা রয়েছে, আল্লাহর হুকুমে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষেত্রেও অসুস্থতার সময় জিব্রিল আলাইহিস সালাম তাকে রুক্বইয়াহ করেছিলেন বদনজর ও হিংংসার প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য
৩,
وَدَّ كَثِیرࣱ مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ لَوۡ یَرُدُّونَكُم مِّنۢ بَعۡدِ إِیمَـٰنِكُمۡ كُفَّارًا حَسَدࣰا مِّنۡ عِندِ أَنفُسِهِم مِّنۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَهُمُ ٱلۡحَقُّۖ
গ্রন্থধারীগণের অনেকেই তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তাদের অন্তরে পোষিত হিংসার দাহনে ইচ্ছে পোষণ করে যে, যদি তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর কুফরীতে ফিরিয়ে নিতে পারত; (সূরা বাক্বারাহ:১০৯)
৪,
العين تدخل الرجل القبر وتدخل الجمل القدر
অর্থঃ বদ নজর মানুষকে কবর পর্যন্ত পৌছে দেয় এবং উটকে পাতিলে । (সহীহ আল জামেঃ শাইখ আলবানী (রহঃ) সহীহ বলেছেনঃ ১২৪৯)
অর্থাৎ মানুষের নজর লাগায় সে মৃত্যুবরণ করে, যার ফলে তাকে কবরে দাফন করা হয়। আর উটকে যখন বদ নজর লাগে তখন তা মৃত্যু পর্যায়ে পৌছে যায় তখন সেটা যবাই করে পাতিলে পাকানো হয়
৫,
জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আলে হাযমকে সাপে দংশিত ব্যক্তির ঝাড়-ফুকের অনুমতি প্রদান করেছেন। আর আসমা বিনতে উমাইসকে বললেন, কি ব্যাপার আমার ভাইয়ের সন্তানদেরকে দুর্বল দেখছি, তাদের কি কিছু হয়েছে? আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন না, কিছু হয়নি তবে বদ নজর তাদেরকে দ্রুত লেগে যায়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদেরকে ঝাড়-ফুক করাও অতঃপর তাকে তার সামনে নিয়ে আসা হলোঃ তিনি বলেন, তাদেরকে ঝাড়-ফুক কর। (ইমাম মুসলিম রেওয়ায়েত করেছেনঃ ২১৯৮)
অনেক সময় বদনজর লাগার কারণে কিছু বাচ্চা কোন কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করতে পারে। এ সম্পর্কে আম্মাজান আয়েশা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে তিনি বলেন,
دَخَلَ النَّبيُّ ﷺ فسَمِعَ صَوتَ صَبيٍّ يَبْكي، فقال: ما لصَبيِّكم هذا يَبْكي؟ هلّا استَرقَيتُم له من العَينِ؟
রাসূল ﷺ (ঘরে) প্রবেশ করে একটি কান্নারত বাচ্চার (কান্নার) আওয়াজ শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের এই ছেলেটি কাঁদছে কেন? তোমরা কেন তার জন্য বদনজরের রুকইয়াহ তলব করছো না?
الألباني، السلسلة الصحيحة (١٠٤٨) • إسناده حسن
৬,
উম্মে সালমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার ঘরে এক মেয়ে শিশুর চেহারায় দাগ দেখে তিনি বলেছেন যে, তার চেহারায় বদ নজরের(জিনের) লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাকে ঝাড়-ফুক করাও। (বুখারীঃ ১/১৭১, মুসলিমঃ ৯৭)
قال الحسين بن مسعود الفرَّاء: وقوله ((سَفْعَة)) أي: نظرة، يعنى من الجن،
এখানে السفعة কে বলা হয়েছে জিনের বদনজরের কথা।
৭,
আবু যর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
ان العين لتولع بالرجل بإذن الله حتى يصعد حالقا فيتردى منه
ইমাম আহমদ ও আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন । এই হাদীসের সারমর্ম হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কোন ব্যক্তির যখন নজর লাগে তখন এত বেশি প্রভাবিত হয় যে, সে যেন কোন উচু স্থানে চড়ল অতঃপর কোন নজর দ্বারা হঠাৎ করে নীচে পড়ে গেল। (শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেনঃ ৮৮৯)
৮,
“Majority of people who die from my ummah after the decree of Allaah and His Qadr is due to the evil eye”. (Declared Hasan by al Albaani)
“ফায়সালা ও তকদীরের পর আমার উম্মতের অধিকাংশ লোক (বদ) নযরের ফলে মারা যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মানুষের নজর বোঝাতে আরবিতে ‘আইন’ বা ‘নাযর’ ব্যবহার হলেও জ্বিনের নজর বোঝাতে আইনুল জিন না বলে সাধারণত ‘আনফুসিল জিন’ ব্যবহার হয়। এই হাদীসে "আনফুস" ব্যাবহার করা হয়েছে। পরে হাদীসের রাবী বলেন, আনফুস অর্থ আইন।
৯,
ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
العين حق تستنزل الحالق
অর্থঃ বদ নজর সত্যি তা যেন মানুষকে উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়। (ইমাম আহমদ ও তা রানী আলবানী হাসান বলেছেনঃ ১২৫০)
মুসনাদে আহমাদের একটি হাদীসে এরপরে এও রয়েছেঃ “এর কারণ হচ্ছে শয়তান এবং ইবনে আদমের হিংসা।"
১০,
আবূ উসামা ইবন সহল (রহঃ)-এর রেওয়ায়ত, ’আমির ইবনে রবী’আ সহল ইবনে হানীফকে গোসল করতে দেখে বললেন, আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখলাম, এই রকম কাউকেও দেখি নাই, এমন কি সুন্দরী যুবতীও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখি নাই। তৎক্ষণাৎ সহলের গায়ে জ্বর আসলো এবং জ্বরের বেগ ভীষণ হলো তিনি লুটিয়ে পড়লেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ খেদমতে হাযির হইয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি সহল ইবনে হুনাইফ (বা হানীফ)-এর কিছু খবর রাখেন কি? আল্লাহর কসম! সে মস্তক উত্তোলন করতে পারছে না। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বল্রন, তুমি কি মনে করছো যে, তাকে কেউ বদনজর দিয়েছে। লোকটি বলল, হ্যাঁ, আমর ইবন রবী’আ (বদনজর দিয়েছে)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আমির ইবন রবী’আকে ডেকে ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে বলেন, তোমাদের কেউ নিজের মুসলিম ভাইকে কেন নিহত করতেছো? তুমি (بارك الله) কেন বললে না? এইবার তুমি তার জন্য গোসল কর। অতএব আমির হাত, মুখ, হাতের কনুই, হাটু, পায়ের আশেপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করে ঐ পানি একটি বরতনে জমা করলো। সেই পানি সহলের দেহে ঢেলে দেওয়া হলো। অতঃপর সদল সুস্থ হয়ে গেলেন এবং সকলের সঙ্গে রওয়ানা হলেন। (মুয়াত্তা মালিক)
১১,
হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে চিন্তিত দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হাসান (রাঃ) ও হুসাইন (রাঃ)-কে বদ নযর লেগে গেছে।" একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা সত্য বটে। নযর সত্যিই লেগে থাকে। আপনি এ কালেমাগুলো পড়ে তাদের জন্যে আশ্রয় প্রার্থনা করেননি কেন?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “ঐ কালেমাগুলো কি?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেন যে, কালেমাগুলো হলোঃ–
اللهم يا ذا السلطان العظيم، والمن القديم، والوجه الكريم، يا ذا الكلمات التامات، والدعوات المستجابات، عاف الحسن والحسين من أنفس الجن وأعين الانس
অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে বড় রাজত্বের মালিক! হে যবরদস্ত ইহসানকারী। হে বুযুর্গ চেহারার অধিকারী। হে পরিপূর্ণ কালেমার মালিক! হে প্রার্থনা কবূলকারী! আপনি হাসান (রাঃ) ও হুসাইন (রাঃ)-কে জ্বিনদের সমস্ত কুমন্ত্রণা হতে এবং মানুষের বদ নযর হতে আশ্রয় দান করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কালেমাগুলো পাঠ করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর সামনে খেলা করতে শুরু করলেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে বললেনঃ “হে লোক সকল! এই কালেমাগুলোর মাধ্যমে তোমাদের জন্তুগুলো এবং স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের জন্যে আশ্রয় প্রার্থনা কর। জেনে রেখো যে, আশ্রয় প্রার্থনার জন্যে এর মত দু'আ আর নেই।” (এ হাদীসটি হাফিজ ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
(বিদ্র: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাদুর বাস্তবায়নে শাইত্বানের বদনজর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। যেমন, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের যাদু করলে শাইত্বান উভয়ের দেহে প্রবেশ করে তাদের সম্পর্ক, ভালোবাসার উপর প্রতিনিয়ত বদনজর-হিংসা দিতে থাকে। এতে তাদের সম্পর্ক দিনকে দিন খারাপভতে থাকে, এক সময় বিচ্ছেদের দিকেও যায়।
কিংবা, কারো ব্যবসায় বাধাগ্রস্থ করার যাদু করা হলো। শাইত্বান অই যাদুর মাধ্যমে ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে রিজিকের উপর বদনজর-হিংসা দিতে থাকে। দেখা যায় অই ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ঠিক তেমনি পড়াশোনায় বাধাগ্রস্থের যাদু, বিয়ের বন্ধের যাদু, পাগল বানানোর যাদু ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে শাইত্বানের আইন-হাসাদ। )