জ্বিন-যাদু, বদনজরের জন্যই কি রুক্বইয়াহ চিকিৎসা?

জ্বিন-যাদু, বদনজরের জন্যই কি রুক্বইয়াহ চিকিৎসা?

Abdur Rahman
২৪ মে, ২০২৬
Ruquyah

রুক্বইয়াহ কিংবা শারঈ ঝাড়ফুক; এ কথা শুনলেই মনে হয় নিশ্চয় শুধু জিন-যাদু-বান-টোনা সারাতে এই চিকিৎসা নেয়া দরকার। কিন্তু না, বরং রুক্বইয়াহ যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই করা যায়, কারণ রুক্বইয়াহ করা হয় ক্বুরআন এর মাধ্যেমে, আর আল্লাহ ﷻ বলেন,

"আর আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়।"(আল-ইসরা:৮২)

আমরা আজকে ১০ টি ঘটনা পড়বো রাসূল ﷺ, সাহাবা এবং সালাফদের থেকে যেখানে তারা জিন-যাদু ঘটিত রোগ বাদে সাধারণ কিংবা জটিল রোগের ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ বা শারঈ ঝাড়ফুক করেছিলেন।

১. সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ:


ইমাম আবু দাউদ রহ. স্বীয় সুনান গ্রন্থে হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তোমরা কেউ যদি অসুস্থ হও অথবা তোমাদের কোনো ভাই অসুস্থ হয়, তাহলে সে যেনো এই দুআ পাঠ করে,

رَبَّنَا الله الَّذِي فِي السَّمَاءِ، تَقَدَّسَ اسْمُكَ، أَمْرُكَ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ كَمَا رَحْمَتُكَ في السَّمَاءِ، فَاجْعَلْ رَحْمَتَكَ فِي الْأَرْضِ وَاغْفِرْ لَنَا حُوبَنَا وَخَطَايَانَا أَنْتَ رَبُّ الطَّيِّبِينَ، أَنْزِلْ رَحْمَةً مِنْ رحمتك، وشفاء من شفائيكَ عَلَى هَذَا الْوَجَعِ

আমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানের অধিপতি। আপনার নাম পবিত্র। আসমান-জমিনে আপনার আদেশ কার্যকর। যেরূপ আপনার রহমত আসমান ব্যাপী পরিব্যপ্ত, অনুরূপ আপনি জমিনেও আপনার রহমত নাজিল করুন। আপনিই পবিত্রদের রব। নিজ রহম থেকে পরিপূর্ণ রহমত নাজিল করুন। পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা দান করুন।

যখন অসুস্থ ব্যক্তি এই দুআ পড়বে আল্লাহর নির্দেশে তখন সে সুস্থতা লাভ করবে।'

২. চেহারায় উঠা ঘা বা পিম্পলের ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ:

ইবনু সুন্নি রহ. স্বীয় গ্রন্থ আমালুল ইয়াম ওয়াল লাইলাহ-এ রাসুল ﷺ -এর কোনো এক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুল ﷺ আমার কাছে আসলেন। তখন আমার হাতের আঙ্গুলে একটি পাঁচড়া (Pimple) হয়েছিল। রাসুল ﷺ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে ‘যারিরাহ' (Tharirah) আছে? আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ। রাসুল বললেন, এটি তোমার পাঁচড়ার উপর রেখে দাও এবং বলো,

اللَّهُمَّ مُصَغَرَ الْكَبِيرِ، وَمُكَبَّرَ الصَّغِيرِ، صَغَرْ مَا بِي.

হে আল্লাহ, আপনি বড় (বিপদ)-কে ছোটকারী (হালকা) এবং ছোট (বিপদ) - কে বড়কারী (বৃদ্ধি)। আপনি আমার উপর আপতিত বিপদকে ছোট (হালকা) করে দিন।

৩. বিচ্ছু দংশনে ঝাড়ফুক:


ইমাম বুখারি এবং ইমাম মুসলিম রহ. উভয়ে সহিহ গ্রন্থে হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসুল -এর সাহাবিদের একটি জামাত কোনো এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রের কাছে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলে গোত্রের লোকজন তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করলো। ওই সময় গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হয়। লোকেরা তার আরোগ্যের জন্য সবধরনের চেষ্টা করলেও কিছুতেই কোনো উপকার হলো না। তখন তাদের কেউ বললো, এখানে যেই কাফেলা অবস্থান করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভালো হতো। সম্ভবত তাদের কারও কাছে কোনো পদ্ধতি থাকতে পারে। গোত্রের লোকজন তাদের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে! আমরা সবরকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারও কাছে কিছু আছে কি? সাহাবিদের একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! আমি ঝাড়ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারি কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারি করোনি। তাই আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করলে আমি তোমাদের ঝাড়ফুঁক করবো না। গোত্রের লোকেরা এক পাল বকরি প্রদানের শর্তে সাহাবা রাযি.-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হলো। ওই সাহাবি রাযি. গিয়ে 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন' (সুরাতুল ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁক দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে সুস্থ হলো) যেনো বন্ধন হতে মুক্ত হলো এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগলো যেন তার কোনো কষ্টই ছিলো না। গোত্রের লোকেরা চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পুরোপুরি প্রদান করল।

৪. ইমাম আবু বকর ইবনু আবি শাইবা রহ. স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন,

একদিন রাসুল আমাদের মাঝে সালাত পড়ছিলেন। যখন তিনি সিজদায় গেলেন একটি বিচ্ছু তার আঙুলে দংশন করলো। রাসুল সালাত শেষ করে বললেন, আল্লাহ তাআলা বিচ্ছুকে ধ্বংস করুন। নবি এবং নবি নয় এমন ব্যক্তি কাউকেই সে ছাড় দেয় না। অতঃপর রাসুল পাত্রে পানি আনালেন। লবণ ঢাললেন এবং দংশিত স্থানটি পানি ও লবণের মধ্যে রাখলেন। কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ' এবং 'ফালাক' ও 'নাস' পড়তে লাগলেন। তারপর তিনি প্রশান্তি লাভ করলেন।

৫. দুরারোগ্য রোগের ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ:

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমি মক্কা-মুকাররমায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আমার কাছে কোনো ওষুধই ছিল না। কোনো ডাক্তারও ছিল না। তখন আমি নিজেই আমার চিকিৎসা এই সুরার মাধ্যমে করা শুরু করলাম। আমি জমজমের পানিতে কয়েকবার এই সুরা পড়ে দম করে পান করতে লাগলাম। এতে আমি পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভ করেছি। অতঃপর এই অভিজ্ঞতা আমি বিভিন্ন ব্যাথা-বেদনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি এবং ব্যাপক উপকৃত হয়েছি।

৬. ইমাম খাল্লাল রহ. বর্ণনা করেন, শিফা বিনতে আবদুল্লাহ জাহেলি যুগে পার্শ্ব ‘ঘা-এর ঝাড়ফুঁক করতেন। যখন হিজরত করে রাসুল -এর কাছে উপস্থিত হন এবং মক্কায় রাসুল ﷺ -এর কাছে বাইআত গ্রহণ করেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুলﷺ ! আমি জাহেলি যুগে পার্শ্ব 'ঘা'-এর ঝাড়ফুঁক করতাম। আমি আপনাকে তা শোনাতে চাই। হযরত শিফা রাযি. দুআ পাঠ করা শুরু করেন,

بسم الله ضَلَّتْ حَتَّى تَعُودَ مِنْ أَفْوَاهِهَا، وَلا تَضُرُّ أَحَدًا، اللهُمَّ اكْشِف الْبَأْسَ رَبِّ النَّاس

রাসুল বললেন, এই দুআটি একটি লাকড়িতে সাত বার পড়ে দম করো এবং একটি পরিষ্কার স্থানে বসো। অতঃপর পুরনো শরাবের সিরকা মিশিয়ে পাথরের উপর ঘষো এবং ফোঁড়ার উপর প্রলেপ করে দাও।

৭. যেকোনো ব্যাথার ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ:

ইমাম মুসলিম রহ.-এর সহিহ গ্রন্থে হযরত উসমান ইবনু আবিল আস রাযি.- এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি রাসুল -এর কাছে অভিযোগ করে বললেন, যখন থেকে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখন একধরনের ব্যথা অনুভব করেন। রাসুল কি বললেন, শরীরের যেখানে ব্যথা অনুভব হচ্ছে সেখানে হাত রেখে

“ বিসমিল্লাহ' তিনবার এবং সাতবার এই দুআ পড় ।

بسم الله ثلاثا، وَقُلْ سَبْعَ مَرَّاتٍ : أَعُوذُ بِعِزَّةِ الله وَقُدْرَتِهِ مِنْ

شَرِّ مَا أَجد وَأُحَاذِرُ.

আমি আল্লাহ তাআলার ইজ্জত এবং কুদরতের ওসিলায় যা অনুভব করছি এবং যার আশঙ্কা করছি তার অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি

বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে বর্ণিত আছে, রাসুল নিজ পরিবারের কাউকে ঝাড়ফুঁক করলে, ডান হাত তার গায়ে রেখে পড়তেন,

اللَّهُمَّ رَبِّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক দুঃখ কষ্ট দূর করে দাও এবং শিফা দান করো। তুমি সুস্থতা দানকারী। তোমার শিফা ব্যতিত কোনো শিফা নাই । এমন শিফা দান করো যাতে কোনো কষ্ট অবশিষ্ট না থাকে

৮. জ্বর ও সকল প্রকার ব্যাথা লাঘবে রুক্বইয়াহ:

ইমাম তিরমিযি রহ. তাঁর জামে তিরমিযি গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. হতে হাদিস বর্ণনা করেছেন, রাসুল ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে জ্বর এবং সকল প্রকার ব্যথা লাঘবে এই দুআ শিখিয়েছেন যে, তোমরা তা নিজ জবানে বলবে, তাহলে আরোগ্য লাভ করবে। দুআটি হচ্ছে এই,

بِسْمِ الله الكَبِيرِ، أَعُوذُ بِالله الْعَظِيمِ مِنْ شَرِّ كُلَّ عِرْقٍ نَعَارٍ، وَمِنْ شَرِّ حَرِّ النَّارِ.

শুরু করছি সুমহান আল্লাহর নামে। আশ্রয় চাচ্ছি মহান আল্লাহর নিকট, পাকস্থলীর সর্বপ্রকার ব্যথা এবং জ্বরের অনিষ্ট থেকে।

৯. জখম ও ফোড়ার জন্য ঝাড়ফুক:

ইমাম বুখারি এবং ইমাম মুসলিম রহ. উভয়ে সহিহ গ্রন্থদ্বয়ে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন কারও কোনো কষ্ট হতো অথবা আহত হতেন অথবা ফোঁড়া দেখা দিতো তখন রাসুল ﷺ শাহাদত আঙুলের মাথা এমনভাবে মাটিতে গেড়ে দিতেন। এই কথা বলে বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান রহ. তাঁর শাহাদত আঙুলি মাটিতে রেখে দেখান। রাসুল এ হাত তুলতেন এবং দুআ পড়তেন,

بِسْمِ اللهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا، يُشْفَى سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا.

আল্লাহর নামে, এই আমাদের জমিনের মাটি এবং আমাদের একজনের মুখের লালার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশে আমাদের রুগীকে শেফা দেওয়া হোক।

সারমর্ম হলো, মুখের লালা নিজ তর্জনী আঙ্গুলে লাগিয়ে মাটিতে রাখবে, তখন মাটির কিছু অংশ আঙ্গুলে লেগে যাবে, তা'সহ আঙ্গুলটি জখমে লেপন করবে ও মুখে আল্লাহর নামের কালেমা পড়বে।

১০. জ্বরের ক্ষেত্রে রুক্বইয়াহ :


জ্বরের ক্ষেত্রে উক্ত আয়াত খুবই কার্যকরী
{ قُلۡنَا یَـٰنَارُ كُونِی بَرۡدࣰا وَسَلَـٰمًا عَلَىٰۤ إِبۡرَ ٰ⁠هِیمَ }
আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের জন্য শান্তিদায়ক ঠান্ডা হয়ে যাও।

[ সোর্সঃ ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহর তিব্বে নববী ]